news | logo

৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং



টাকার গাছ!

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৯, ১২:৪৫

টাকার গাছ!

জামাল সৈয়দ

মিনেসোটা (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে

আমার বাসায় আছে তিন তিনটা ছোট–বড় আইফেল টাওয়ার। প্যারিস ভ্রমণের সময় আসল আইফেল টাওয়ারের সামনের ফুটপাত থেকে কিনেছিলাম। বিক্রেতার নাম ইব্রাহিম। সে ছিল শুধু প্যারিসে পরিচয় হওয়া ৭ নম্বর ইব্রাহিম। এর দুই দিন আগে জগৎখ্যাত ল্যুভ মিউজিয়ামের সামনে আরও চারজন ইব্রাহিমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে।

সবাই হকারি করে। সবাই সেনেগালের। সবাই এক নামে বাংলাদেশকে চেনে। শুধু তাই না, তারা সবাই বাংলাদেশকে ভালোও বাসে। সর্বোপরি সবাই ভালো ছবি তোলে। বোনাস হিসেবে ছবি তুলে দেয় ফ্রিতে। শর্ত একটাই। তাদের কাছ থেকে স্যুভেনির কিনতে হবে। একটা কিনলে পাঁচ ডলার কিন্তু তিনটা দশ। সব ইব্রাহিমের এক কথা, এক দাম। তিনটা টাওয়ারের মধ্যে একটা সাইজে বড়, বাকি দুটি ছোট।

প্যারিস ভ্রমণ শেষে আমেরিকায় ফেরত এলাম। পরিবার ও ছোট ছেলেমেয়ে বেজায় খুশি। প্যারিস থেকে কেনা আইফেল টাওয়ারের স্থান হলো ড্রয়িংরুমের শেলফে।

বড় আইফেল টাওয়ার গেল ছেলের জন্য বরাদ্দকৃত শেলফে। লেগো দিয়ে বানানো নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টির পাশে। তার পাশে আরও লেগো দিয়ে বানানো বিশ্বের কিছু ল্যান্ডমার্ক আছে। যেমন লন্ডন আই, প্রাচীন রোমের কলোসিয়াম, দুবাই টাওয়ার, একটা রঙিন পৃথিবী (গ্লোব)।

নিচের শেলফে আমার ব্যক্তিগত কিছু বাংলাদেশি কালেকশন। যেমন হাঁটু পর্যন্ত লাল ছায়া ওঠানো নতুন বিয়ে করা বউ, ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী মুড়ির টিন (বাস), ওপরে লেখা সদরঘাট টু কুড়িল, রিকশা, মাটির ইঁদুর, পালতোলা নৌকা, কাঠের কুমির ইত্যাদি।

সবচেয়ে নিচের শেলফ আমার তিন বছরের মেয়ের জন্য বরাদ্দ। ওই শেলফটিই হচ্ছে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। পৃথিবীর সবচেয়ে নামীদামি রাজকন্যাদের বসবাস। প্রিন্সেস সিনড্রেলা, প্রিন্সেস এলসা ও প্রিন্সেস জেসমিনসহ অনেক প্রিন্সেস থাকে ওখানে। কোনো এক কারণে সব প্রিন্সেসই এক পায়ে দাঁড়ানো এবং তাদের কিছু না কিছু একটা মিসিং। সবারই হাসিখুশি মুখ।

কোনো এক কারণে প্রিন্সেস এলসার এক পা নিখোঁজ। অন্য পায়ে দামি জুতো। কিন্তু উল্টো দিকে ঘোরানো। তার সোনালি চুলের একাংশে সবুজ রং করা। সম্ভবত খেলার সাথি হিসেবে সে খুব বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। বেচারী। ওই শেলফে আরও আছে ক্যাসল ও বিভিন্ন ধরনের আসবাব।

এ তো গেল শেলফে রাখা জিনিসপত্রের ফিরিস্তি। শেলফ ছাড়াও রান্নাঘরের ভেতরের দিকে দেয়াল ঘেঁষে আছে কয়েকটি টব। তাতে মোট পাঁচটা টাকার গাছ। এখনো ছোট। মানুষ দিয়ে তুলনা করলে এখনো মায়ের দুধ খায়। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা পানি দিই। পর্যাপ্ত রৌদ্রের জন্য জানালা খুলে দিই ওদের দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য।

অনেক আগে এক বৃদ্ধ আমেরিকানের কাছ থেকে শুনেছিলাম, গাছ-গাছালিরও নাকি আবেগ আছে। ওরাও নাকি গান–বাজনা পছন্দ করে। এতে নাকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সেই মোতাবেক মাঝেমধ্যে টবের সামনে নিয়ে গান ছেড়ে দিই। যেহেতু টাকার গাছ তাই টাকাসম্পৃক্ত গানই শোনাই। এই তো গতকালই একটা গান সেলফোনে বাজিয়ে শোনালাম।

‘ওরে টাকা তুমি সময়মতো আইলা না
এই টাকা চাইলাম যাহার তরে
সে চইলা গেল পরের ঘরে
তোমারে পাইলাম কিন্তু
তারে তো পাইলাম না।’

জগতের কী এমন জিনিস আছে যা আমার নাই। চিন্তা করতেই শান্তিতে বুক ভরে যায়। বিধাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হই বারবার। প্রতিদিন অফিস থেকে এসে একবার শেলফের দিকে তাকাই। আরেকবার টাকার গাছগুলোর দিকে। মন ভরে যায় প্রশান্তিতে। দেশের বন্ধুবান্ধবের বিপদে–আপদে টাকাপয়সা পরিমাণমতো দিতে না পারলে সেলফোনে টাকার গাছের ছবি পাঠাই। সঙ্গে লিখে দিই আরও কিছুদিন একটু কষ্ট কর। গাছে কলি এসেছে মাত্র, ফুল ফুটবে শিগগিরই। তবে কথা দিচ্ছি ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আগামী মাসে যেভাবেই হোক টাকা পাঠাব। হয়তো এতে কিছুটা সান্ত্বনা থাকে।

এভাবেই যাচ্ছিল দিনকাল। কিন্তু বিধাতার লীলা বোঝা বড় দায়। মাঝেমধ্যে তিনি মানুষকে বিরাট পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেন। তারপর দেখেন তার বান্দা কী করে। কী মনে করে আজকে আমি বাংলাদেশের পত্রিকা পড়তে গেলাম। একটা সংবাদ আমার সব ভালো থাকার মোমেন্টাম শেষ করে দিল। নিজেকে বেকুব বেকুব লাগছে।

খবরে প্রকাশ সাম্প্রতিক ক্যাসিনো অভিযানে কোনো এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় চার চারটি টাকা গণনার মেশিন। একটি মেশিন এক বান্ডিল টাকা গণনা করতে ছয় সেকেন্ড সময় নেয়। গণনা ছাড়াও মেশিনগুলো নকল টাকাও শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি আরেকটি সংবাদ, এক অঞ্চলে রাস্তার পাশে অসংখ্য কুচিকুচি করে কাটা টাকার খনি পাওয়া গেছে। গ্রামের অসংখ্য লোক গেছে সেই কুচিকুচি টাকার খনি দেখতে।

আমার দুঃখ লাগছে টাকা গণনার মেশিন কেনার বিষয়টি কেন ভুলেও মাথায় এল না। অথচ দিনরাত টাকার গাছের যত্ন নিচ্ছি। আমার মতো এই রকম চিন্তাভাবনাহীন মানুষ তো বিরাট আনপ্রোডাক্টিভ। তবে মন্দের ভালো, গাছগুলো এখনো ছোট। তা না হলে গাছ ফল দেওয়া শুরু করলে খবরই ছিল। থুতু দিয়ে টাকা গুনতে গুনতে পুরো পরিবারের সবার জিব শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত।

টাকার গাছের কথা চিন্তা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। খোয়াব দেখি টাকার গাছে কলি এসেছে। লাল রঙের অসংখ্য কলি। মোড়ানো থেকে আস্তে আস্তে কলি খুলতে থাকে। সেই কলির ভেতর অনেকগুলো ভাঁজ। প্রতিটি ভাঁজে মোড়ানো এক হাজার টাকার চকচকে নোট। টাকার গন্ধে চারদিকে মৌমাছিদের আনাগোনা। হঠাৎ বাতাস এসে টাকার গাছকে দোলা দিয়ে যায়। জানালা দিয়ে বাতাসে উড়ে চলে যায় অনেকগুলো টাকা। নীল আকাশে প্রজাপতির মতো উড়তে থাকে। আমি পেছন পেছন দৌড়াই টাকাকে ধরতে। টাকা আমাকে ধরা দেয় না।




সম্পাদক ও প্রকাশক : মি. আহমেদ

অফিস লোকেশন:

১১০, গোয়ালবাড়ী, কাফরুল

মিরপুর-১৪, ঢাকা-১২০৬।

ফোন: ০১৯২২২৭৭৭৪৭ নিউজরুম: ০১৯২২২৭৭৭৩২

ই-মেইল: sales@bdwebs.com